একটি নতুন স্বপ্নের প্রত্যাশায়-১

From WikiEducator
Jump to: navigation, search



একটি নতুন স্বপ্নের প্রত্যাশায়-১


মাহ্‌মুদুল হক ফয়েজ


নিদারুন এক ক্রান্তিকালের মধ্য দিয়ে আমরা আমাদের সময় গুলো অতিবাহিত করে যাচ্ছি। স্বাধীনতার এতটা বছর পর যেখানে আমাদের আরো এগিয়ে যাবার কথা ছিলো, সেখানে আমরা বার বার যেন মুখ থুবড়ে পড়ে যাচ্ছি। যে গৌরবে আজ আমরা মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারতাম, সেখানে আমাদের করতে হচ্ছে শুদ্ধি অভিযান। বড় বড় রাঘব বোয়ালরা একে একে ধরা পড়েছে। নতন নতুন তদন্ত হয়েছে। দুর্নীতির দুষ্ট চক্র গুলো ধীরে ধীরে জাতির সামনে উন্মোচিত হচ্ছে।

প্রতি বছর আমরা ঘটা করে পালন করি বিজয় উৎসব। ১৯৭১ সনে এক রক্তয়ী যুদ্ধে আমরা অর্জন করেছিলাম আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি। পেয়েছিলাম আমাদের প্রিয় স্বাধীনতা। সেদিন জাতির সামনে ছিলো এক সুদূর প্রসারী সম্ভাবনার স্বপ্ন। কিন্তু বার বার আমাদের সে স্বপ্ন ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। সে যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছিলো গরিব খেটে খাওয়া আপামর জনগণ। কথাছিলো সকলের অংশগ্রহনের মধ্যদিয়ে এ দেশটি গড়ে উঠবে সুখি সমৃদ্ধশালী আত্মনির্ভরশীল একটি দেশ হিসাবে। আমাদের অবারিত প্রকৃতি, বিপুল মানব সম্পদ আর নিজস্ব জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে আমরা সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে যাবো। কিন্তু কি দুর্ভাগ্য আমাদের, স্বাধীনতার এতটা বছর কথার জঞ্জাল ছাড়া আর কোনো সম্পদের মালিক আমরা হতে পারিনি। দীর্ঘ প্রায় ছত্রিশটি বছর পরে এসে দেখতে পাই, এক কষ্টের জঞ্জালে আমরা মুখ থুবড়ে পড়ে আছি। এ দীর্ঘ সময়ে যত টুকু উন্নয়ন হওয়ার কথা ছিলো ততটুকু উন্নয়ন আমাদের হয়নি।

একটি দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য ছত্রিশ বছর অনেক দীর্ঘ সময়। চীন, জাপান, কোরিয়া, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর কোন দেশই উন্নয়নের অভীষ্ঠ ল্েয পৌঁছাতে এতটা সময় নেয়নি। খুবই মন্দ ভাগ্য আমাদের। হাজার হাজার কোটি টাকার উন্নয়নের জোয়ারে বারে বারে শুধু হাতে গোনা কিছু মানুষের ভাগ্য বদল হল রাতারাতি। আমাদের আপামর জনসাধারণের ভাগ্য সেই জোয়ারে ভেসে গেল। আমরা যে তিমিরে ছিলাম সেই তিমিরেই রয়ে গেলাম। সত্যিকার ভাবে সেই তিমির টুটাবার স্পৃহা আমাদের মাঝে কখনো কোনো দিন সৃষ্টি হয়নি। বার বার শুধু আমরা একে অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে গেছি। উন্নাসিকতা,দাম্ভিকতা, অহমিকা আমাদের গ্রাস করে রেখেছে। সেই কালো গহ্বর থেকে বের হবার চেষ্টা কেউ কোনো দিন করিনি।

আজ বড় বিপন্ন সময়ের শিকার আমরা। এদেশের বীর মুক্তিযোদ্ধা, লাখো শহীদ আর বীরাঙ্গনাদের কাছে আমাদের অঙ্গীকার ছিল একটি সুখী, সমৃদ্ধ দেশ বিনির্মানে আমরা নিজেদের উৎসর্গ করবো। তাদের সে স্বপ্ন রূপায়নে আমরা থাকবো নিবেদিত প্রাণ। স্বাধীনতা প্রাপ্তির পর আমরা আমাদের স্বপ্নের কথা ভুলে স্বার্থের পিছনে ছুটতে শুরু করলাম। চেতনার বৈকল্যের শিকার হয়ে আমরা হারিয়ে ফেলতে থাকলাম আমাদের সব সুস্থ্য চিন্তাকে। বুদ্ধির বিভ্রান্তিবশে আমরা বিভাজিত হয়ে পড়লাম ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশে। আমাদের দুর্নীতি আর দারিদ্রের কাছে বিবর্ণ হয়ে গেলো একটি রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধ। আমাদের সহিংসতা আর সংকীর্ণ স্বার্থের কাছে পরাভূত হলো সব মানবিকতা আর মহানুভবতা।

১৯৫২, ১৯৬২, ১৯৬৯ এ বীর বাঙালী অসাধারণ সব ইতিহাস রচনা করেছিলো। ১৯৭১ এ বীর বাঙালী মহাকালের রক্তিম আকাশে এক উজ্জল নত্র হয়ে আবির্ভুত হয়েছিলো। সে জাতি আজ পৃথিবীতে ভিুক জাতির পরিচয়ে পরিচিত। গত প্রায় ছত্রিশ বছরে আমাদের অর্জন হলো, আমরা দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন, নারী নির্যাতনে দ্বিতীয়, এসিড নিক্ষেপে শ্রেষ্ঠ। এখানে আজও সুশাসন অর্জন হয়নি। বারবার মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে। ব্যর্থ রাষ্ট্রের মাল্যভূষিত করার সব আয়োজন প্রায় সম্পন্ন। প্রিয় জন্মভূমির এতগুলো দুরাবস্থাকে মেনে নেয়া কোন সুস্থ্য বিবেকবান দেশ প্রেমিক নাগরিকের পে অসম্ভব। তবুও অপ্রিয় সত্য হচ্ছে, এ সব দূরাবস্থার মাঝেই আমরা নিরন্তন বসবাস করে আসতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি। এখন সব কিছু যেন আমাদের গা’ সওয়া হয়ে গেছে।এই জাতি একদিন সবাই মিলে আত্মনির্ভর হয়ে আতœসম্মান নিয়ে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখে ছিলো, তাই বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিতে কার্পন্য করেনি এ জাতি। মাত্র নয় মাসে ত্রিশ ল তাজা প্রাণ আর তিন ল মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে স্বাধীনতাকে জয় করতে পারে যে জাতি, সে জাতি অল্প কয়বছরের ব্যবধানে দুর্নীতি আর দারিদ্রের কাছে হেরে যাবে এটা মেনে নেয়া কষ্টকর। বড় নির্দয় সময় আমাদের। বিস্তর ব্যবধান তৈরী করে দিয়েছে আমাদের প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির মাঝে। এত আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে যে দেশটা আমরা অর্জন করতে চেয়েছিলাম, আর আজ যে বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে আছি এ দু’য়ের মাঝে দূরত্ব অনেক। এক দিকে আছে আমাদের কাঙ্খিত বাংলাদেশ। যেখানে রয়েছে সুখি সমৃদ্ধশালী দুর্নীতিমুক্ত সন্ত্রাসমুক্ত সকলের সমঅধিকার প্রাপ্ত আত্মনির্ভরশীল একটি দেশ। তার অন্য দিকে আছে দরিদ্র পিড়িত সন্ত্রাস কবলিত সু-শাসন আর মানবাধিকার বঞ্চিত একটি দুর্নীতিগ্রস্ত মেরুদন্ডহীন দেশ।

কোন্ দেশটি চাই আমরা। নিশ্চই শেষেরটি কোনো অবস্থাতেই নয়। অথচ সেই পঙ্কিল বাস্তবতাতেই আমরা ডুবে আছি। এটি জাতি হিসাবে চরম অপমানজনক দুর্ভাগ্যে ভরা। এ পঙ্কিলতা থেকে আমরা মুক্তি চাই। এভাবে কোনো দেশ চলতে পারেনা।


আমরা এখনো স্পষ্ট করে জানতে পারিনি, আমাদের মুক্তির সঠিক পথ কোনটি। পথের সন্ধানে আর আমরা ভূল পথে পা বাড়াতে চাই না। পিড়িত সময়ের কাছে, দূর্ভাগ্যের কাছে নিজেদের সঁপে দেওয়া কাপুরুষতার লণ। আমরা ঘুরে দাঁড়াতে চাই, সব জঞ্জাল পেরিয়ে আমরা আবার পৃথিবীর বুকে মাথা উচুঁ করে দাঁড়াতে চাই। এত কিছুর পরেও আমরা নিরাশ হতে চাইনা। আমরা হতাশ নই। ধ্বংসের শেষ গহ্বরেও লুকিয়ে থাকে সৃষ্টির নব দিগন্ত।

গুনীজনের বানী, “যদি তুমি দেখ যে, তোমার সামনে সম্ভাবনার সবগুলো দারজা বন্ধ হয়ে গেছে তবুও তুমি নিরাশ হবে না। চেষ্টা করে দেখো নিশ্চই সম্ভাবনার কোন না কোন একটি জানালা তোমার জন্য কোথাও না কোথাও খোলা আছে।” আমরা বিশ্বাস করি আমাদের সততা, নিষ্ঠা আর সমবেত প্রচেষ্টা আমাদের সাফল্যের দিগন্তে পৌঁছে দিবে।

শত নৈরাজ্যের মাঝেও আমরা খুঁজে ফিরি সেই রক্তস্নাত প্রিয় মাতৃভূমিকে। যে দেশের সকল মানুষ সবাই সুখি সুন্দর স্বাস্থ্যবান। যে দেশের কোনো মানুষ অভূক্ত নেই। এখানে ুধার জ্বালায় কেউ আত্মহত্যা করেনা। কারো সম্পদ কেউ জোর করে আত্মসাৎ করে না। রাষ্ট্রের সম্পদ লুঠ করে কেউ কালো টাকার পাহাড় গড়েনা। কারো মুখের গ্রাস কেউ কেড়ে খায়না। এসিড ছুঁড়ে দিয়ে কেউ কারো মুখ ঝলসে দেয়না। যে দেশে বোমা, খুন, রাহাজানি নেই। যে দেশের মানুষগুলো প্রকৃতির মত সুন্দর। যে দেশে শিশুরা সদাচঞ্চল নির্ভয়, যে দেশের নারীরা নিরাপদ। খুঁজে ফিরি সেই প্রিয় মাতৃভূমি প্রিয় বাংলাদেশ, যে দেশের প্রতিটি মানুষ প্রতিশ্রুতিশীল, দায়িত্ববান, নিষ্ঠাবান। খুঁজে ফিরি সেই প্রিয় বাংলাদেশ, যে দেশ ভিক্ষার মত ঘৃনিত অমর্যাদাকর ঝুলি ছুঁড়ে দিয়ে নিজেকে বিনির্মান করছে দুর্নীতিমুক্ত আত্মনির্ভরশীল আত্মমর্যাদাবান জাতি হিসাবে।

আমরা ফের সবার জন্য সবাই আর একটা স্বপ্ন কি দেখতে পারিনা !



মাহমুদুল হক ফয়েজ



Foez 07:28, 19 January 2010 (UTC)